বস ব্যাপারটা নিয়ে অধিকাংশ মানুষের অভিজ্ঞতা খুব সুখের নয়। স্বার্থপর বস, কঠিন ও কঠোর বস, ফাঁকিবাজ বস, অহংকারী বস বা রীতিমত শয়তান বস, এরকম বসেদের প্রায় সব চাকুরীজীবী মানুষই দেখেছে আবার নিজেরা যখন বস হয়েছে তখন নিজেরাও এরকম কিছু একটাতে পরিণত হয়েছে।
অফিস এর ওয়াটারকুলার মোমেন্ট গুলোয় যদি বসকে নিয়ে কাঁটাছেড়া না হয় তাহলে অফিস ব্যাপারটার মাহাত্ম্যই থাকে না।
আমার বস যাঁরা ছিলেন তাদের নিয়ে অনুযোগ করার বিশেষ সুবিধে আমার হয় নি। হয়তো কেউ একটু কঠিন কঠোর ছিলেন কিন্তু ভিতরে ভিতরে তিনিই আবার কোমল মনের মানুষ ছিলেন। কিন্তু এঁদের অনেকেই হয়ে উঠেছিলেন আমার শিক্ষক। এঁদের কল্যাণেই আমার মত লোকের সোমবার সক্কাল সক্কাল উঠে অফিস দৌড়াতে হলেও কোনো বিরক্তি ছিলো না।
আমার একটা বড় আফসোস ছিলো ক্লাস ১১ থেকে ইউনিভার্সিটি ফাইনাল ইয়ার অবধি সাত সাতটা বছর হাতে গোনা একজন দুজনকে বাদ দিলে ভালো শিক্ষক পাই নি বললেই চলে। ১১ /১২ এর শিক্ষক যাঁদের দেখেছি তারা প্রায় সকলেই টিউশন পড়াতেন। তাঁদের কাছে টিউশন পড়লে প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যায় এমন একটা খবর হাওয়ায় ভাসতো। কলেজের শিক্ষকরা আবার বিশাল সিলেবাস নিয়ে হিমশিম খেতেন। তাঁদের নোট লেখানো ছাড়া বিশেষ কিছু করার সুযোগ ছিলো না।
সেই সাত বছরের অসম্পূর্ণ শিক্ষার ফল সারা জীবন ধরে শিখে যাওয়া। এটা খুবই কঠিন কাজ। পড়াশুনো করতে এমনিতেই ভালো লাগে না কারোর। তার উপরে যদি সেটা সারা জীবন অনির্দিষ্ট কালের জন্য চালিয়ে যেতে হয়।
কিন্তু চাকরি করতে এসে ভালো শিক্ষক যদি বস বা সহকর্মী হিসেবে পাওয়া যায় ব্যাপারটা আর অতটা কঠিন থাকে না।
আমার ব্যাপারটা অনেকটা সেরকম।
আমার প্রথম বস ভাশি আর কার্থিক। একজন তামিলনাড়ুর আর একজন কেরালার। এঁদের কল্যাণে আমার চাকরিজীবন শুরুর বছরের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো ছিলো। যে সব জিনিষ জানার বা শেখার সুযোগ স্কুলে বা কলেজে একেবারেই ছিলো না সেসব জিনিষ শেখার সুযোগ করে দেওয়ার কৃতিত্বটা তাদের।
এমবিএ পড়লেও ডাটা স্ট্রাকচার, SQL এর বেসিক, ম্যানেজমেন্ট একাউন্টিং, রেশিও অ্যানালাইসিস, সেলস আর মার্কেটিং এসব নিয়ে ভাসা ভাসা একটা ধারণার বেশি কিছুই ছিল না। তাই ভাশি আর কার্থিককে কি ঝামেলাতেই না পড়তে হয়েছিল আমাকে নিয়ে। কিন্তু ওরা হাল ছাড়েনি।
বছর দুএক পরে একবার খুব শরীর খারাপ হওয়ায় বাড়ি ফিরে যাবো মনস্থির করে কার্থিককে গিয়ে বললাম। কার্থিক বললো, 'যাবি তো যা কিন্তু কলকাতায় তোকে কেউ চাকরি দেবে না। এখানে ফিরে চলে আসিস। তোর জায়গায় কাউকে নেবো না আপাতত'।
যাই হোক আমি শুনিনি কার্থিকের কথা। বাবার সাথে পরামর্শ করে কলকাতায় চলে এলাম এবং চাকরি পেলাম একটি ইকোনমিক রিসার্চ কোম্পানিতে। কোম্পানিটি বোম্বের।
যেদিন যোগ দিলাম কলকাতা অফিসে, বোম্বে থেকে এলেন আমার বস। পড়াশোনা ব্যাপারটা এই অর্গানাইজেশনের মজ্জায় ছিলো। তার উপরে পুরো ব্যাপারটাই দেশের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে। তাই একটুও একঘেয়ে নয়। কিন্তু যেটা এখানে শিখলাম প্রথমদিন, আমার নতুন বসের কল্যাণে, সেটা হল কাউকে স্যার বা ম্যাডাম বলা যাবে না আর কোনো মিটিং এ গেলে যদি ১৫ মিনিটের বেশি বসিয়ে রাখে তো বিনয়ের সাথে মিটিং পোস্টপোন করে ফিরে আসতে হবে। বুঝলাম চাকরি করতে এসে অন্যের সামনে নিজেকে ছোট করা চলবে না।
তবে কাজের সূত্রে শেখার ব্যাপারে সবচে বেশি যাঁকে আমায় ক্রেডিট দিতে হবে সে হল সমীর। সমীর খেলাধুলায় তুখোড়। ভালো গায়ক। সাড়ে ছফিট লম্বা। বস যদি বেছে নেবার সুযোগ থাকে তো সমীর হচ্ছে আদর্শ ক্যান্ডিডেট।
কলকাতায় একদিন আমি আর সমীর গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে ইন্টারভিউ এর নামে দু ঘণ্টা অনেক আলোচনা করলাম। সমীর আর আমার মত কোনো ব্যাপারেই মিলল না।
আমি আমার কলকাতার চাকরি নিয়ে বেশ খুশি ছিলাম। অতএব আরেকটা চাকরি খোঁজার কোনো ইচ্ছেই ছিলো না। কিন্তু যখন সমীর বললো 'তুই বোম্বেতে চলে আয়' তখন না করতে পারলাম না।
২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতা থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবার বোম্বেতে এসে নতুন চাকরিতে এসে জয়েন করলাম। সমীর ওর কেবিনে বসে ডাঁই করা বইয়ের মাঝে বসে AC র জানালাটা খুলে সিগারেট খাচ্ছিল। আমি যেতেই আমার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে পড়তে বললো।
দেখি চিঠির উপরে লেখা আছে "ইনক্রিমেন্ট"। মানে চাকরিতে যোগ দেওয়ার প্রথম দিনেই আমাকে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হলো। আমি যে মাইনের কথা শুনে চাকরিতে যোগ দিতে রাজি হই তার থেকে কিছুটা মাইনে বেড়ে গেলো প্রথম দিনেই।
আমি এই চিঠিটা নিতে প্রথমে অস্বীকার করলাম। আমি তো কোনো কাজই করি নি তখনও অব্দি। সমীর বললো, গোটা তিরিশেক লোকের মাইনে বাড়ানো হয়েছে তাদের কোয়ালিফিকেশন এবং এক্সপেরিয়েন্স এর বিচার করে। তার মধ্যে আমার নামও আছে। বোঝো কান্ড।
এই ঘটনার ফলে সবচে ভালো ব্যাপার যেটা হয় যে মাইনে নিয়ে কোনো নিরাপত্তাহীনতায় আমাকে কোনোদিন ভুগতে হয় নি। মাইনে বাড়ানোর জন্য কোনো আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা কোনোদিন বোধ করি নি। একটা পারস্পরিক বিশ্বাস সবসময়ই ছিল। সেই প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার জন্য।
সমীর আর আমি দুজনেই ঘুরতে ভালবাসতাম। আর মাছ খেতেও। আর এই ঘোরাঘুরির মধ্যেই অনেক কিছু শেখা হয়ে যেত। তার মধ্যে সবচে সেরা সমীরের রুলস।
রুল নম্বর ১। ফোকাস। যখন যেটা করবে মন দিয়ে করবে। একটা জিনিষ করবার সময় পঞ্চাশটা জিনিষ ভেবে মাথা খারাপ করলে কাজের কাজ হবে না।
রুল নম্বর ২। কোনোকিছু Assume করবে না। সামান্য সংশয় থাকলেও জিজ্ঞেস না করে কোনো কিছু ধরে নিলে পরে আফসোস করতে হবে।
রুল নম্বর ৩। এটা রুল নম্বর ২ এর ভ্যারিয়েশন। কেউ কিছু করতে বললে বা কিছু চাইলে জিজ্ঞেস করবে "why" বা "what is the objective"!
রুল নম্বর ৪। চাপে পড়ে হ্যাঁ কক্ষনো বলবে না।
এই রুলগুলো আমি সবচে বেশি সমীরের উপরই ব্যবহার করেছি। ধরা যাক সমীর আমাকে বললো কোনো একটা ডাটা পাঠাতে। আমি সোজাসুজি না পাঠিয়ে আগে জিজ্ঞেস করবই what is the objective!
সমীর আরেকটা জিনিষ শিখিয়েছিল সেটা অ্যাকাউন্টেবিলিটি। দায়িত্ব। সেটা শেখানোর একটা মেথড ছিল একটা মোক্ষম প্রশ্ন। What have you done about it?
ধরা যাক আমি সমীরকে কোনো অজুহাত দিলাম কোনো ব্যাপারে। সমীর জিজ্ঞেস করবে, "what have you done about it?" অজুহাত যাই হোক না কেনো এই প্রশ্ন টার সামনে সব অজুহাতই জব্দ। যাকে প্রশ্নটা করা হবে সে বুঝতে পারবে অতি সহজেই যে আসলে তার হাতেই সব ক্ষমতা ছিল কিছু করার।
আমি কোনো কিছু লিখলে, চিঠি চাপাটি হোক, কোনো রিপোর্ট বা কন্ট্রাক্ট, আমার কাজ ছিল একবার সমীরকে দিয়ে লেখাটা পড়ানোর। সমীর কোনোদিন আমার লেখা পড়ে সরাসরি ঠিক কোনটা ভুল হয়েছে বলতো না। খালি এটা বুঝিয়ে দিত যে আরো ভালো লেখা যেতে পারে। ভাবটা এই যে ঠিক কোন জায়গাটা ভালো হয়নি সেটা তুমি নিজে আবিষ্কার করে ঠিক করো।
যদিও আমার ধারণা ছিলো সমীর পারফরম্যান্স এভালুয়েশান করার সময় অন্যদের ব্যাপারে বেশি উদার, কিন্তু তা সত্ত্বেও সমীরের সাথে কাজ করার বা আড্ডা দেবার একটা আনন্দ ছিলো। কেনো সেটা বোঝা যাবে একটা ঘটনা বললে।
একবার আমাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে কলকাতার একটি সরকারি ব্যাংক থেকে। তাদের কর্পোরেট ঋণ গ্রহীতাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ। ব্যাংকের চেয়ারম্যান সমীরকে অনেকদিন চেনেন এবং সমীহ করেন। এবার আলোচনার মধ্যে কোনো একটা জায়গায় এরকম পরিস্থিতি হলো যেখানে আমাদের না বলতে হবে। আর চেয়ারম্যানের আশা যে যেহেতু সমীরকে উনি চেনেন আর সমীর আমার বস সেহেতু সমীর হ্যাঁ বললে সেটাই ফাইনাল।
Chairman: So, Sameer, what do you think? Lets agree on this. I am sure you can ask your team.
Sameer: Sankar has independent charge. If he agrees, I have no objection. But its upto him to decide.
কারুর কাছে প্রমোশন মানে একটা চিঠি, কারুর কাছে একটু বেশি মাইনে। আমার ক্ষেত্রে সেইদিন আমার প্রথম ও শেষ প্রমোশন হয় একেবারে সোজা CEO পদে, কোনো চিঠি বা ইনক্রিমেন্ট ছাড়াই। যখন সমীর এটা বুঝিয়ে দেয় একটা বাচ্চা ছেলেই সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা রাখে।
বসেদের কথা বলতে বসে সুবীরের কথা না বললে ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
সুবীর মানে সুবীর গোকর্ন, যিনি RBI এর ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। কিন্তু তার আগে বছর সাতেক আমার বস। অসম্ভব ইন্টেলিজেন্ট, সুবক্তা, তুখোড় সেন্স অফ হিউমার আছে কিন্তু পোকারফেস, খাদ্য রসিক। এবং যথারীতি মাছ প্রেমী।
কাজের জন্য কোথাও যেতে হলে সাথে সুবীর থাকলে একঘেয়েমির কোনো ব্যাপারই নেই। যে কোনো শহরের, সে মেক্সিকো সিটি হোক বা হায়দরাবাদ, কোথায় কি খাবার পাওয়া যায় সব তার নখদর্পণে।
কিন্তু সুবীর আমার দেখা সেরা ইকোনমিকস এর শিক্ষক। আমরা যারা ইকোনমিকস এর কিছুই বুঝি না তারা সুবীরের মত শিক্ষকের সংস্পর্শে এলে ইকোনমিকস কে ভালো না বেসে পারবেই না।
ওকে যতই বোকা বোকা প্রশ্ন করো, জবাব দিতে ওর ক্লান্তি নেই। তোমার মতামত যতই বোকা বোকা হোক শোনার জন্য ধৈর্য্যের অভাব ওর হবে না। টোকিও বা হংকং এর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কোনো কিছু দেখে বা এক্সপেরিয়েন্স করে তাই নিয়ে আলোচনা করতে করতে কিছুটা ইকোনমিকস শেখা হয়ে যাবে।
একবার সোলে আমাদের সেমিনার শেষ হয়েছে সন্ধ্যে সাতটায়। সুবীর বলল ওর মেয়ে বেন টেন এর ফ্যান। সে বলেছে সুবীরকে বেন টেন এর একটা খেলনা কিনে আনতে। আমরা ভাবলাম হোটেলে ফেরার আগে একটা মল এ ঢু মেরে খেলনাটা কিনে নেওয়া যাবে। গোটা তিনেক মল ঘুরে পায়ে যখন ফোস্কা পড়বে পড়বে করছে তখনও আমরা কোথাও খেলনার দোকান খুঁজে পেলাম না। কোরিয়াতে জন্ম হার খুব কম আর সেজন্য বাচ্চাদের খেলনার চাহিদা আর দোকান প্রায় নেই বললেই চলে। এর পরের সেমিনারের আগে আমাদের প্রেজেন্টেশন এ একটা নতুন চ্যাপ্টার যোগ হলো ভারতবর্ষের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড নিয়ে।
আর একবার একটি বড় ব্যাংকের সাথে আলোচনার সময় তাদের এগ্রিকালচার লোন সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানা গেলো। দেখা গেলো ব্যাংকের পক্ষে এটা জানা খুব দরকার যে কোথায় ক্রপ ফেলিওর হতে পারে। সুবীর এই সমস্যার একটা সমাধান বার করলো। বর্ষা যত এগোবে সব এগ্রিকালচারাল ব্লক এর বৃষ্টিপাতের হিসেব আর সেখানকার সেচের হিসেব যোগ করে কোথায় প্রয়োজনের থেকে কম বা অতিরিক্ত বেশি জলের যোগান আছে দেখা। অতি সহজ কিন্তু ইনোভেটিভ এবং কার্যকরী সমাধান।
সুবীরের সেন্স অফ হিউমার ছিলো এপিক। একবার একটি মিটিংএ কোনো একটি বিদেশী পেনশন ফান্ডের ম্যানেজার জিজ্ঞেস করলেন, "so what is your long term outlook?"
সুবীর খুব গম্ভীর মুখে বলল, "well, in the long term everyone is dead".
একবার সুবীর এসেছে IMF এর হয়ে বক্তৃতা করতে। আমি শ্রোতার আসনে। একজন সুবীরকে জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা এই অটোমেশন, এ আই ইত্যাদি আসার ফলে কোন প্রফেশন গুলোর সবচে বেশি সমস্যা হবে?"
সুবীর একটুও না ভেবে বলল, "ইকোনমিস্টদের আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না।"
অথচ এই মানুষটিই আবার বন্ধু হিসেবে ছিল শিশুর মত সরল। আমরা গুরুর মত শ্রদ্ধা করলেও ওর তরফ থেকে ব্যাপারটা ছিলো বন্ধুত্বের। আবার ওদের কথামত না চলে নিজের ইচ্ছেমত কাজ করেও, এমনকি রীতিমত প্রতিবাদ টতিবাদ করা সত্ত্বেও ওরা আমাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন। কেনো সেটা এখনো আমার কাছে রহস্য।
আফসোস, সুবীর আর আমার একটা প্ল্যান বাস্তবায়িত করা হয়ে উঠবে না। আমাদের মোটরসাইকেল চেপে সান ফ্রান্সিসকো থেকে লস এঞ্জেলেস ট্যুরটা না হওয়া রয়ে গেল।
Leave a comment