খুব ছোটবেলায় যখন ছোট শহরের বাসিন্দা আর সব বাবা মায়ের মত আমার বাবা মাও আমাকে শহরের ভালো ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করতে চেয়েছিল, বেঁকে বসেছিল আমার দাদু। দাদু নিজে স্কুলের শিক্ষক, আর সেই আমলে ভূগোলের স্নাতক। আমার বাবা তার কথা মেনে চলত। তাই দাদু যখন বললো যে নাতিকে রামকৃষ্ণ মিশন ছাড়া অন্য কোথাও ভর্তি করা ঠিক হবে না সেটা অমান্য করা বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
এর ফলে আমি প্রথম থেকে দশম শ্রেণী অব্দি পড়েছি দুটি রামকৃষ্ণ মিশনে। আসানসোলে ষষ্ঠ শ্রেণী অব্দি। বাকিটা পুরুলিয়ায়। আসানসোলের স্কুল বোর্ডিং স্কুল ছিলো না। আর পাঁচটা স্কুলের মতই সবাই বাড়ি থেকে যাতায়াত করত রোজ, গুটি কয়েক ছাত্র ছাড়া। পড়াশুনোর মান জেলার বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো ছিলো। কিন্তু একটা ইজি গোইং ব্যাপার ছিলো। দুষ্টু ছেলেরা দুষ্টু হলেও কোনো ব্যাপার না। ভালো হলে কথাই নেই। এরকম আর কি।
পুরুলিয়ার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। সেখানে ভর্তি হওয়া মানেই একটা চাপের ব্যাপার। নতুন স্কুলে মানিয়ে নেওয়া, বাড়ির আদর কি তা ভোলার আগেই মানুষ হিসেবে ব্যর্থ না হবার চাপ।
যেহেতু সেখানে ছাত্র শিক্ষক সবাই চব্বিশ ঘণ্টাই স্কুলের চৌহদ্দির মধ্যে, তাই পড়াশোনার বাইরেও মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে একটা বেশ গুরুত্ব দেওয়া হত।
নিজের কাজ নিজে করা, রুটিন মেনে খালি ঘণ্টা মিনিট নয়, পুরো দিন-সপ্তাহ চলা, সবার সাথে সব অ্যাকটিভিটিতে অংশগ্রহণ করা এগুলোর উপরে খুব জোর দেওয়া হতো।
এর সাথে আরো একটা ব্যাপার খুব গুরুত্ব পেত, দৈনিক প্রার্থনা আর কিছু উৎসব যেমন জন্মাষ্টমী, দোলযাত্রা। আমাদের বাড়ির সবাই ধর্মীয় রীতিনীতিতে বিশ্বাসী হলেও, কোনো কারণে শৈশবেই ধর্মীয় আচার নিয়ে আমার মনোভাব আলাদা ছিল। কিন্তু স্কুলে আমার নিজের মত করে থাকতে কোনো অসুবিধে হয় নি। মোটামুটিভাবে শিক্ষকরা আমাকে আমার মত থাকতেও দিয়েছেন আবার ভালোও বেসেছেন। এমনকি ঢিপ ঢিপ করে গুরুজনরা সবাই মহারাজদের প্রণাম করছে দেখেও আমি হ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে আছি যখন, তখনও ওনারা আমাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন। কিছু শিক্ষক ছিলেন যাঁরা একধাপ এগিয়ে আধুনিক চিন্তার বীজ বপন করতেও ছাড়েন নি। এমনকি এটাও বুঝিয়েছেন যে প্রশ্ন করা ব্যাপারটা কতটা ইম্পর্ট্যান্ট।
অনেকসময় প্রশ্ন না করে বিশ্বাসের ভিত্তিতে আমরা অনেক কিছু ধ্রুব সত্যি বলে মেনে নিই। এতে যে বিশ্বাস করে তার এবং যে বিশ্বাস করায় দুপক্ষেরই সুবিধে। পুরো ব্যাপারটা বেশ অল্প সময়ে বিনা ঝামেলায় মিটে যায়। প্রশ্ন করলে অনেক ঝামেলা। বোঝাও রে, তক্কো করো রে, তক্কে হেরে গেলে যুক্তি খোঁজো রে।
কিন্তু প্রশ্ন করলে অনেক কথার মাঝে যে সারটুকু থাকে সেটা নেওয়া সহজ হয়। এতে পরিশ্রম থাকে ঠিকই, কিন্তু লাভ অনেক। শৈশবে সব কিছুকে প্রশ্ন করাটা একটা মজাও বটে। বেড়াল যেমন টেবিল থেকে সব কিছু ফেলে দেয় একটা মজার খেলা হিসেবে, আমিও স্কুলে শেখা সব রামকৃষ্ণ কথামৃত, গীতাসার ইত্যাদি বাড়িতে বাবার সাথে আলোচনা করতাম এবং প্রশ্ন করতাম। এখানে প্রশ্ন মানে কোশ্চেন নয়, চ্যালেঞ্জ। বাবাকে এসব ব্যাপারে বেকায়দায় পড়তে দেখলে আমার যা আনন্দ হত তা বলে বোঝানো যাবে না। বাবা একদিকে বাম মনোভাবাপন্ন, রবীন্দ্রনাথের ভক্ত, অন্যদিকে হিন্দু আচার এবং রামকৃষ্ণদেবে বিশ্বাসী। যার ফলে বাবাকে বেকায়দায় ফেলার কাজটা বেশ সোজা ছিলো।
এর পরে কয়েক দশক কেটে গেছে। আমিও নিজেকে রামকৃষ্ণ মিশনের অপদার্থ ছাত্র হিসেবে মেনে নিয়েছি। বন্ধুরা জোর করে স্কুলে টেনে নিয়ে গেলে এখনো আমার আড়ষ্ট লাগে, আমি তো রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের সম্বন্ধে সে ভাবে কিছুই জানি না।
দিন যায়, কর্মসূত্রে বিজনেস এথিক্স ইত্যাদি নিয়ে কাজ আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। আমার প্রশ্ন করার বাজে অভ্যাস কিন্তু থেকেই যায়।
যে প্রশ্নটা সারাদিন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে সবচে বেশি সেটা হল, মানুষ এত লোভী কেনো হয় যে ১০০০ কোটি টাকা কামানোর পরেও ট্যাক্স ফাঁকি দিতে চায়। সেদিন শুনলাম শচীন টেন্ডুলকারের নাম এসেছে প্যানডোরা পেপারস এ। ঘটনা সত্যি কি না জানি না। কিন্তু যাদের অনেক আছে তারা এরকম ব্যবহার করে তার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে।
আর একটা প্রশ্ন দিনে একবার আসবেই মাথায়। ধর্মের প্রশ্নে সবাই এতো তেরিয়া কেনো? আফগানিস্তান, বাংলাদেশ সবত্রই এক জিনিস। My way, or highway. এটাই হচ্ছে আজকের আধ্যাত্মিক জগতের সার কথা। কেন? এরকম তো হবার কথা ছিলো না।
আমরা যদি সবাই একটা ছোট হাঁসের ছানাও হতে পারতাম, পরমহংস নাই বা হলাম। পরমহংস যিনি তিনি তো নিজের কাজ করে দিয়েই গেছেন। তাঁর ভক্তরা একটু ঘেঁটে ফেলেছে আবার। তাই আমাদের আবার ছোট হাঁসের ছানা হবার দরকার পড়েছে।
উনি তিনটি বাক্য আর বারোটি শব্দে এই শতাব্দীর সবচে প্রয়োজনীয় কথা দেড়শো বছর আগে বলে গেছেন। সময় হবার অনেক আগেই বলেছেন হয়ত বা। তাই লোকে গুলিয়ে ফেলেছে।
১। টাকা মাটি মাটি টাকা
যে বাবা সারা জীবন প্রচুর টাকা রোজগার করায় মনোনিবেশ করেছে আর তার ছেলে ড্রাগ এডিক্ট, তাকে জিজ্ঞেস করো। সে বলবে এর থেকে বড় সত্যি নেই। যে সরকারি হাসপাতালের ক্লার্ক রোগীর পরিবারের কাছে ঘুষ নিয়েছে কিন্তু নিজের করোনা চিকিৎসার সময় ICU বেড পায়নি, তাকে জিজ্ঞেস করো। কোম্পানির যে মালিক, নিজের লভ্যাংশ বাড়ানোর জন্য পিওনকে (যার ব্লাড গ্রুপ ছিলো ও নেগেটিভ) চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছে, কিন্তু তার বাবার ওপেন হার্ট সার্জারির সময় ও নেগেটিভ রক্তদাতা খুঁজে পায় নি, তাকে জিজ্ঞেস করো। সবাই বলবে টাকা মাটি। অবশ্য জমির দালাল আর রাজনীতিবিদ বলবে মাটিই টাকা। তাদের আমি বলবো পুরো চার শব্দের বাক্যটাই পড়তে। কে বলতে পরে কবে কাজে লেগে যাবে!
২। যত মত তত পথ
বাঙালি যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গর্ব করে। যেমন বিভূতিভূষণ বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিয়ে গর্ব করে তেমনি এই বাক্যবন্ধটি নিয়েও গর্ব করতে পারে। এ জিনিস পৃথিবীতে আর কোনো জাতির কাছে নেই। কিন্তু এটা চুরি হয়ে যাবার প্রভূত সম্ভাবনা আছে। বাঙালি জাতি দ্বিধাবিভক্ত এবং দ্বিধাদীর্ন। ধর্মই এর মূল কারণ। আজ আমরা বাংলাদেশে যা হতে দেখছি, আমার ভয় হয় যে সাধারণ বাঙালি হিন্দু না "যত মত তত পথ" কথাটা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়।
কিন্তু খালি আধ্যাত্মিক চেতনায় নয়, কথাটা আরো ব্যাপক অর্থেও সত্যি। মানুষের বা সমাজের উপকার করতে কোনো বিশেষ পথ নয়, অনেক পথ আছে আর তার প্রত্যেকটাই সত্যি। এক পথ আর অন্য পথের মধ্যে কোনো ঝগড়া নেই। মানে থাকার কথা নয়।
৩। শিব জ্ঞানে জীব সেবা
যখন মহামারী শুরু হল, দেখলাম মুম্বাইতে প্রচুর মানুষ আটকে। তাদের রেশন কার্ড নেই, হাতে নগদ টাকা নেই, থাকার জায়গা নেই। কিন্তু অবাক কান্ড, অনেক মানুষ এদের সাহায্য করার জন্য উঠেপড়ে লেগে গেলেন। আমি সাধারণ মানুষকে এরকম অন্যের জন্য করতে দেখবো ভাবতেই পারি না। শুধু মানুষই নয়। একদল মানুষ পাড়ার কুকুরদের খাবার বানিয়ে খাওয়াতে শুরু করলেন। শিব জ্ঞানে জীব সেবার প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা দিতে হবে কে ভেবেছিল!
আমাকে কেউ এই অপবাদ দেবে না যে আমি স্পিরিচুয়াল। আধ্যাত্মিকতার ছাত্র হিসেবে আমি F পাওয়ার যোগ্য। আমার এই বিষয়ে কাউকে জ্ঞান দেবার কোনো অধিকারই নেই। আমি রামকৃষ্ণদেব আর স্বামী বিবেকানন্দকে এতো প্রশ্ন করেছি যে ওনারা বেঁচে থাকলে নিশ্চই কানমলা খেতাম।
কিন্তু ওদের ধন্যবাদ প্রাপ্য যে এই তিনটি সামান্য বাক্যে পাহাড়প্রমান শিক্ষা জলের মত সহজ করে দিয়ে গেছেন। আমরা একদল সেটা ভুলে মেরে দিতে প্রাণ পণ করেছি। আরেকদল এই শিক্ষা ঘেঁটে দিতে জল ঘোলা করে চলেছি।
আরেকদল আছে যাদের এই শিক্ষার ধারেকাছে আসার সৌভাগ্য হয় নি।
Leave a comment