চার বছর তিহার জেলের থেকেও কড়া এক স্কুলের হোস্টেলে থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাইরে এসে মনে হল এটাই স্বাধীনতা। ভোর পাঁচটায় ওঠা নেই, দৌড়তে যাওয়া, ড্রিল করা, সময়ে খেতেই হবে, স্নান করতেই হবে এসব বাঁধাধরা নিয়ম নেই। দারুণ মজা।
হোস্টেলের দুষ্টু ছেলে আর ভালো ছেলেদের দুষ্টুমির বায়োডাটা মোটামুটি একই রকম। দুষ্টু ছেলেদের ক্রিয়েটিভ ফ্রীডম হোস্টেলে প্রায় নেই বললেই চলে। আসানসোলে ব্যাপারটা ১৮০ ডিগ্রি আলাদা। দুষ্টু ছেলেরা সেখানে একেকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্য।
তা সেসব দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে দোস্তি মানে অনেক যাতায়াত করতে লাগবে। তারা পুরো শহরকে নিজেদের কর্মস্থল মনে করে। এক আধ কিলোমিটারের মধ্যে এদের কাজকর্ম মেটে না। তাছাড়া আমাদের রেলের কোয়ার্টার থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে খানিকটা সময় লাগে।
অতএব বাবাকে বললাম আমার একটি সাইকেল লাগবে। বাবা দেখলাম পরেরদিন তার বন্ধুর কাছ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে একটি পুরনো দুধওয়ালার সাইকেল নিয়ে এলো। এই ঘটনায় আমি যাকে বলে মর্মাহত হলাম। যদিও ৩০০ টাকা তখনকার দিনে বাবার মত রেল কর্মচারীর একমাসের মাইনের বেশ খানিকটা, তবু আমার সেসময় ওসব বোঝার মত বুদ্ধি ছিল না। তার উপর আমার কিছুটা অভিমান ছিল আগের চার বছর ধরে পুজোর সময় স্কুলের ইউনিফরম ছাড়া অন্য কিছু না পাওয়ায়। যাই হোক শেষমেশ বাবা রাজি হল একটা নতুন সাইকেল কিনে দিতে। ৮৫০ টাকা তখনকার দিনে বেশ অনেকটা টাকা।
অনেক মার্কেট রিসার্চ করে যে সাইকেলটা মনে ধরল সেটার নাম BSA SLR, মাদ্রাজের কোম্পানি TI, তাদের বানানো সাইকেল। BSA মোটর সাইকেল যে বারমিংহামের বন্দুকের কারখানাটি বানায় তাদের সাথে কি সম্পর্ক ঠিক জানা নেই। তবে, সাইকেলটি হাল্কা আর মডার্ন। সাদা সাইডওয়ালের চাকা, লাল মেটালিক পেন্ট আর রুপোলী স্টিকার। সব মিলিয়ে দারুণ।
এটা বাবার একেবারে মনে ধরল না। বাবার ব্রান্ড লয়ালটি লিজেন্ডারি। রেডিও বলতে ফিলিপ্স, তালা বলতে গোদরেজ, ব্যাঙ্ক বলতে SBI আর সাইকেল বলতে খোদ আসানসোলের সেন র্যালে কোম্পানির সাইকেল। এই সেন র্যালে সাইকেল কারখানায় আমার জেঠু আর মামারা চাকরি করে তখন। আর বাবার বাহন বলতে এই সেন র্যালের হাম্বার সাইকেল। এই মজবুত সাইকেলটি বাবা সারা জীবন অফিসে যাওয়া আসার জন্যে ব্যবহার করে তারপর কাউকে দান করে গেছে।
সেন র্যালের কারখানাটি একটি দারুণ ব্যাপার। মহাযজ্ঞ যাকে বলে। সেই কারখানায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সবাইকে ঢুকতে দিতো। বিশাল এলাকা জুড়ে একটা কারখানা। তার থেকেও বড় জায়গা নিয়ে কর্মচারীদের আবাসন, খেলার মাঠ ইত্যাদি।
কারখানার ভিতরে কোথাও টেম্পার করে চেন বানানো হচ্ছে। কোথাও ক্রোম প্লেটিং হচ্ছে হ্যান্ডেলবারে। কোথাও স্পোক বানানো হচ্ছে। খালি টায়ার আর নাটবল্টু ছাড়া সব একই কারখানায় বানানো হচ্ছে। এখানেই আমি জানতে পারি সাইকেলের শ্যাসিতেও গাড়ির মতো একটা ইউনিক নম্বর লেখা থাকে।
কোথায় মুঞ্জলদের হিরো সাইকেলের ওয়ার্কশপ আর কোথায় এই সেনদের কারখানা। যদিও বাণিজ্যের স্বাভাবিক নিয়মে সেনদের কারখানার আর বিশেষ কিছুই বাকি নেই কঙ্কাল টুকু ছাড়া। কেন নেই, কী হতে পারতো সে অনেক কথা। তবে সে কথা পরে আরেকদিন।
ফিরে আসি আমার BSA সাইকেলে।
এই সাইকেলটি ১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল অব্দি ছিল আমার বিশ্বস্ত সঙ্গী। কত যে ঘটনার সাক্ষী আর কোলাবোরেটর।
একবার আমার বন্ধু রজত, রোগা লিকলিকে কিন্তু অসম সাহসী (সে খালি তার মাকে ভয় পায়, আমরাও পাই)। এসে বলল দে তোর সাইকেলটা দে। নিয়ে তো গেলো আর ফেরে না। আমি খুঁজতে বেরিয়ে তাকে পেলাম সুভাষ সিনেমা হলের বাইরে। একটা বিশাল বাসের পথ আমার পিদ্দি সাইকেল দিয়ে আটকে ভয়ানক জ্যাম সৃষ্টি করেছে। বাসওলা তার কাছে হয়তো টিকিট চেয়েছিল না কী। তার প্রতিবাদে চাক্কা জ্যাম। সম্বল বলতে সাইকেল।
এই সাইকেলটির যত্ন আত্যি আমিই করতাম। সেটা করতে গিয়ে বেশ খানিকটা মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং শিখে ফেললাম। যে লোকটা চাকার সাথে একদিকে ঘোরা গিয়ারটা আবিষ্কার করেছিলো তার বুদ্ধির কথা ভেবে অবাক লাগত। (সাইকেল, টাইপরাইটার আর মেকানিকাল ঘড়ির আবিষ্কারকদের আমার সবথেকে বুদ্ধিমান মনে হত।) ভাবতাম যদি বুদ্ধিমান হতেই হয় এরকম হতে হবে। একদিন সাইকেলের গিয়ারটা খুলে দেখলাম কী ভাবে একদিকে ঘোরালে চাকাটা চলে কিন্তু অন্যদিকে ঘোরালে কিছুই হয় না। যদিও পরে বাবার অফিসের জিপ চালায় যে, চিকু নাম, তার সাহায্য লাগলো গিয়ারটা জোড়ার জন্যে।
যখন ইউনিভার্সিটি গেলাম, বুঝতে পারলাম সেখানে সাইকেলটি না থাকলে হয়রানি হবে যারপরনাই। ক্লাস, হোস্টেল, খেলার মাঠ সব দূরে দূরে। অতএব সেটাকে ট্রেনে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হল।
একদিন হোস্টেলে আমরা কেউ ছিলাম না। কোন দুঃসাহসী চোর একটা ট্রাক এনে সব সাইকেল তুলে নিয়ে চলে গেলো। আমরা ফিরলাম যখন সবার তো মাথায় হাত। যাই হোক থানায় কমপ্লেন করা হলো। অন্যদের সবার কালো দুধওলা সাইকেল। অনেকেই ঠিক করে কোন কোম্পানির সেটাও বলতে পারল না। তারা বেশিরভাগই সস্তায় পুরনো ছাত্রদের কাছ থেকে কিনেছে।
থানার পুলিশ বলল সাইকেল উদ্ধার করতে পারলে খবর দেবে। যদি আমাদের রিপোর্টে সাইকেল চেনার মতো কোনও তথ্য থাকে। আমার জেঠুর শেখানো শ্যাসি নম্বরের ব্যাপার জানা থাকায় আর বাবার সব রশিদ, কাগজ ইত্যাদি ফাইল করে রাখাটা খুব কাজে দিলো। আমি সাইকেলের রশিদের কপি থানায় জমা দিলাম যেটায় শ্যাসি নম্বর লেখা ছিল।
এর পর প্রতি সপ্তাহে আমি নিয়ম করে হারানো সাইকেলের খোঁজ নিতে থানায় হাজিরা দিয়েছি। এই ভাবে ছমাস কেটে যাওয়ার পর একদিন থানা থেকে ডেকে পাঠানো হলো আমাকে। কোথায় নাকি বেআইনি মদের ঠেকে ছাপা মেরে একটি BSA SLR সাইকেল পাওয়া গেছে। তা আমি মহা উৎসাহে গেলাম সেটি আনতে। কিন্তু থানায় পৌঁছে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। যদিও সাইকেলটা নতুন কিন্তু শ্যাসি নম্বর মিলছে না।
থানার বড়বাবু মনে হলো সাইকেলটা আমায় গছিয়ে দিতে পারলে বাঁচেন। ওই থানায় হয়ত সেরকম ভাবে কোনও গোয়েন্দাগিরি করার সুযোগ ছিল না। তাই সাইকেলটা আমায় গছালে কেস ক্লোজড বলা যায়। তিনি প্রায় জোর করে আমাকে সাইকেলটি দিয়ে থানা থেকে তাড়িয়ে দিলেন।
কিন্তু এই অন্যের সাইকেলের সাথে আমার কোনোরকম কানেকশনই তৈরি হলো না। সাইকেলটা যেন চুরি করেছি মনে হতো। আর আমার সাইকেলটা কোথাও জং ধরে পড়ে আছে ভেবে মন খারাপ হতো। যাই হোক ইউনিভার্সিটির পরে যখন আমি মুম্বই চলে এলাম তখন সেটা কাউকে বাবা দিয়ে দিয়েছিল।
বিমল মুখার্জি নামে একজন শুনেছি সাইকেল নিয়ে সারা পৃথিবী ঘুরেছে। আরেকজন লিজেন্ড রামনাথ বিশ্বাস। এরা সব সাইকেল পাগল লোক আমার মতো। আমি পৃথিবী না ঘুরলেও খালি আসানসোলেই যা ঘুরেছি তা পৃথিবী ঘোরার সমান অন্তত কিলোমিটারের হিসেবে। আর তখন আমার হাড্ডি সর্বস্ব চেহারার পিছনেও এর অবদান অনেক।
এই সাইকেল নিয়ে যেটা আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ ছিল সেটা হল মহিশীলা কলোনির পিছন দিক দিয়ে যে রেলের লাইন গেছে আর ধানক্ষেত সেসব পেরিয়ে, বার্নপুরের এয়ার স্ট্রিপ পেরিয়ে, লামেয়ার পার্কের পাশ দিয়ে একদম দামোদরের ধারে চলে যাওয়া যেখান থেকে বিহারীনাথ পাহাড় দেখা যায় আর যেখানে নদীর জল শীতকালে কাঁচের মতো স্বচ্ছ। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়। যাওয়ার সময় অনেকটা রাস্তা সাইকেলের উপর আমি। আবার কাদামাটি যেখানে বেশ খানিকটা সাইকেল আমার কাঁধে। দুই বন্ধু মিলে নদীর পাড়ে যাওয়া।
হোস্টেল থেকে বেরুনোর পর এই সাইকেলটাই ছিল আমার কাছে স্বাধীনতার প্রথম স্বাদ।
Leave a comment